দুর্ঘটনা কমাতে ১১১ সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ

কাজী জেবেল:

সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনা ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে এ সংক্রান্ত কমিটির দেয়া ১১১ সুপারিশের একটিও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে ৫০টি সুপারিশ গত ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তাবায়নের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স ও ৬টি কমিটির দাফতরিক কার্যক্রমেই আটকে আছে এসব সুপারিশ বাস্তাবয়ন কার্যক্রম। একইভাবে আটকে আছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের কার্যক্রমও।

এক বছরের বেশি সময় ধরে এ কাউন্সিলের কোনো সভা হচ্ছে না। অথচ প্রতিদিনই সড়কে দুর্ঘটনায় ঝরছে নিরীহ মানুষের প্রাণ। আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন অনেকে।

এমন পরিস্থিতিতে আজ উদযাপন হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মুজিববর্ষের শপথ, সড়ক করব নিরাপদ’। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সড়ক দুর্ঘটনা, এতে মৃত্যু ও আহতের পরিসংখ্যান নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। সরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠেনি এ সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডারও। পুলিশ, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ও বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাবে দুর্ঘটনার একেক ধরনের তথ্য উঠে আসছে।

বেসরকারি সংগঠনগুলোর তুলনায় সরকারি হিসাবে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা অনেক কম। পুলিশ ও বিআরটিএর হিসাবে ২০১৯ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ১৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ১৩৮ জন মারা গেছেন ও আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৪১১ জন।

নিসচা’র হিসাবে একই বছর ৪ হাজার ৭০২টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫ হাজার ২২৭ জন। যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাবে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা আরও বেশি। সংগঠনটির মতে, ওই বছর ৫ হাজার ৫১৬টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮৫৫ জন মারা গেছেন।

জানা যায়, সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি গত বছর ১১১ দফা সুপারিশ করে। আশু করণীয়, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে এসব বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।
২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সর্বশেষ সভায় ওই কমিটির রিপোর্ট গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সভাপতি করে ৩৩ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

টাস্কফোর্স আবার ৬ জন সচিবের নেতৃত্বে ৬টি কমিটি গঠন করে দেয়। এভাবেই সভা ও কমিটির দাফতরিক কার্যক্রমে আটকে আছে সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ। এ বিষয়ে জানতে টাস্কফোর্সের সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে কয়েকবার ফোন দেয়া হয়। পাশাপাশি মেসেজও পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং মেসেজের জবাবও দেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাস্কফোর্সের একাধিক সদস্য জানান, ২০১৯ সালের মধ্যে ৫০ দফা, ২০২১ সালের মধ্যে ৩২ দফা ও ২০২৪ সালের মধ্যে ২৯ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা আছে কমিটির প্রতিবেদনে। কিন্তু টাস্কফোর্স ওই সময়সীমার মধ্যে সুপারিশ বাস্তবায়নের মতো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

এর কারণ হিসেবে তারা জানান, টাস্কফোর্সে ১২ জন সচিব, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধান এবং মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এর বাইরে কয়েকজন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি সদস্য হিসেবে টাস্কফোর্সে রয়েছেন।

উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার কারণে টাস্কফোর্সের কাজে তারা সময় দিতে পারেন না। এ পর্যন্ত মাত্র এক-দুটি সভা হলেও সেখানের বেশির ভাগ সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে সুপারিশ বাস্তবায়ন আলোর মুখ দেখছে না।

জানতে চাইলে টাস্কফোর্সের সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ যুগান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণ দেখিয়ে টাস্কফোর্সের মিটিং হচ্ছে না। অথচ যেসব প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়, সেসব প্রকল্প নিয়ে সভার পর সভা ঠিকই হচ্ছে।

তিনি বলেন, টাস্কফোর্স গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত একটি মিটিং হয়েছে। ৬ জন সচিবের নেতৃত্বে কমিটি কটি মিটিং করেছেন, প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন কিনা- তাও আমরা জানি না।

এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, সড়কের ওপরের হাট-বাজার উচ্ছেদসহ অনেক সুপারিশ সহজেই বাস্তবায়ন করা যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গরজের অভাবে সে কাজও হচ্ছে না।

টাস্কফোর্সের আরেক সদস্য বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এরপর করোনাভাইরাসের প্রকোপ চলে আসায় টাস্কফোর্সের সভা করা যায়নি। টাস্কফোর্সের আরেক সদস্য নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো কাজই হয়নি।

কোনো সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে ৬টি কমিটি গঠন করা হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু পর কাজ থেমে আছে।

টাস্কফোর্সের গঠন করা ৬টি কমিটির মধ্যে একটি হচ্ছে সচেতনতা তৈরি ও প্রচার সংক্রান্ত কমিটি। এ কমিটিতে আছেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুদ্দিন নেওয়াজ। কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজ একদম হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। সম্ভবত দুই মাস আগেও আমরা মিটিং করেছি। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি।

সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ১১১ দফা সুপারিশ কমিটির প্রধান ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান।

তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং চালক ও বিআরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়ালেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে। এছাড়া সড়ক ও যানবাহনের প্রকৌশলগত ত্রুটি সারাতে পদক্ষেপ নেয়া এবং সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ : বিআরটিএ জানিয়েছে, চতুর্থবারের মতো আজ বৃহস্পতিবার উদযাপন করা হবে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর বিআরটিএ ভবনে আলোচনা সভা হবে।

এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে টিভি মনিটরের মাধ্যমে আলোচনা অনুষ্ঠান প্রদর্শন করা হবে।

দিনটি উপলক্ষে বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবাইকে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ তথা সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রী, পথচারী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা রোধ করতে পারব অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক নিরাপত্তাকল্পে সংশ্লিষ্ট সবাই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাবেনয় এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।