ট্রাকভর্তি চামড়া নিয়ে ব্যবসায়ী বাকরুদ্ধ

রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে হতবাক হারুনুর রশিদ। ছবি : মোহাম্মদ ইব্রাহিম

জাকের হোসেন:

ঈদের দিন নরসিংদী থেকে ট্রাকে করে এক হাজার ২০০ গরুর চামড়া নিয়ে রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় আসেন হারুনুর রশিদ। রাত ১২টায় পৌঁছান তিনি। পৌঁছানোর পর আড়তদাররা চামড়ার মূল্য ধরেন ৪০০ টাকায়। কেনা দামেও রাতে বিক্রি করতে পারেননি। অপেক্ষায় থাকেন সকালের।

সকালে মূল্য হাঁকা হয় ১০০ টাকা করে। এতে কপালে ভাঁজ পড়ে হারুনুর রশিদের। যে ট্রাকে করে চামড়া এনেছেন ট্রাক ভাড়া দেওয়ার টাকাও নেই তাঁর কাছে। সুদের ওপর টাকা নিয়ে নরসিংদীর বিভিন্ন জায়গা থেকে চামড়া কিনে ঢাকায় এসে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।

শুধু হারুনুর রশিদ নন পোস্তা এলাকায় দেখা মেলে অনেক চামড়া ব্যবসায়ীর। যারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চামড়া এনে কেনা দামও পাচ্ছেন না। তাই পরবর্তীতে বিক্রির আশায় কেউ পার্কে, কেউ স্থানীয় ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছেন।

রাজধানীসহ সারা দেশে পশু কোরবানির চামড়া ব্যবসায় গত বছরের মতো এবারও ধস নেমেছে। চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছে খুচরা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। গরুর চামড়া কম মূল্যে বিক্রি হলেও ছাগলের চামড়া কিনছে না কেউ। ছাগলের চামড়ার স্থান হচ্ছে ফুটপাত ও ডাস্টবিনে।

আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে লালবাগের পোস্তা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে চামড়ার স্তুপ আর স্তুপ। কেউ কেনার আশায় কেউ বা বিক্রির আশায়।

তবে যারা রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চামড়া নিয়ে এসেছেন তাদের কেউ লাভে চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না। কোনোমতে ছেড়ে যতে পারলে বেঁচে যান তারা।

পোস্তা এলাকায় প্রবেশের পথে বসে ছিলেন সামসু মিয়া। তিনি জানান, বড় গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৬০০ ও মাঝারি গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় কিনেছেন। ছাগলের চামড়া তিনি কিনছেন না।

পোস্তা এলাকার ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, রাজধানীতে গত বছর যে পরিমাণ চামড়া কেনা হয়েছিল এবার তার ৭০ শতাংশ কম চামড়া কেনা হয়েছে। চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। একেবারে পানির দরে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। প্রকারভেদে প্রতিটি গরুর চামড়া ১০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১০ টাকায় কেনা হয়েছে। তবে বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় নেওয়া হয়।

মূল্য কম হওয়ায় অনেক কোরবানিদাতা চামড়া বিক্রি না করে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করেছেন। তবে পশুর চামড়ার দাম কম হওয়ার দুস্থরা বঞ্চিত হয়েছেন। পোস্তায় এনে এসব ব্যবসায়ীরা কেনা দামও পাচ্ছেন না। ছাগলের চামড়ার স্থান হচ্ছে ডাস্টবিনে।

রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে হতবাক হারুনুর রশিদ। ছবি : মোহাম্মদ ইব্রাহিম

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ছোট চামড়াই বেশি আসছে এবার। চামড়া প্রক্রিয়াজাতে লবণের খরচ আছে। কাটিংয়েও বাদ যাবে কিছু চামড়া। তা ছাড়া শেষ পর্যন্ত কী দাম পাওয়া যাবে, তা নিয়ে আশঙ্কায় আছেন অনেক ব্যবসায়ী।

আড়তদারদের বকেয়ার বিষয়ে সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই ট্যানারির মালিকেরা আর্থিক সংকটে আছেন। সে জন্য আড়তদারদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না অনেকে।

এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ২০ থেকে ২৯ শতাংশ কমিয়ে ধরা হয়েছে। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়া কেনাবেচা করতে হবে প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে,যা গত বার ছিল প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। সে হিসাবে দাম কমানো হয়েছে ২৯ শতাংশ। আর ঢাকার বাইরে ধরা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৮ থেকে ৩২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এ ক্ষেত্রে গত বছরের চেয়ে দাম কমানো হয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।

এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া গত বছরের প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা থেকে ২৭ শতাংশ কমিয়ে ১৩ থেকে ১৫ টাকা করা হয়। আর বকরির চামড়া গত বছরের ১৩ থেকে ১৫ টাকা বর্গফুটের দর থেকে কমিয়ে এবার ১০ থেকে ১২ টাকা করা হয়েছে।

বিডি/ঢা/অ