ভাসানচর দেখে মুগ্ধ হয়েছ রোহিঙ্গা নেতারা

ভাসানচরে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদল

অনলাইন ডেস্ক :

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে যে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, সেটি দেখে ভালো লেগেছে কক্সবাজারের শরাণার্থী শিবির থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি দলের অনেকের। দলের অধিকাংশ সদস্য ভাসানচরের আবাসন প্রকল্পের অবকাঠামো দেখে সন্তুষ্ট। তবে সেখান থেকে ফিরে পুরো অভিমত প্রকাশ করতে চায় রোহিঙ্গা নেতারা।

রোববার সন্ধ্যায় ভাসানচর থেকে মুঠোফোনে রোহিঙ্গা নেতা মোস্তফা জানান, সকাল ১০ থেকে দুপুর পর্যন্ত গাড়িতে করে ভাসানচর ঘুরে দেখেন তিনিসহ ৪০ জন রোহিঙ্গা নেতা। সাগরের বুকে জেগে উঠা এই চরে গড়ে তোলা স্থাপনাগুলো ভাল লেগেছে। রয়েছে সেখানে শান্তির পরিবেশও।

তিনি বলেন, শুরুতে তাদের খাদ্য গুদাম দেখানো হয়। তবে সেটি খালি ছিল। এর পর আশ্রয় সেন্টার, মসজিদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, খেলার মাঠ ও কবরস্থানসহ মাছ চাষের পুকুর পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া সেখানে বিভিন্ন প্রকারের সবজির বাগানও। পাশপাশি সাগরের তীরে কেওড়া বাগান অনেকে মুগদ্ধ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে যদি বলি, রোববার পর্যন্ত সরকারের গড়ে তোলা আবাসন প্রকল্পগুলো খুুবই চমৎকার লেগেছে। কাল (সোমবার) পুরো প্রকল্পগুলো দেখে বিস্তারিত বলা যাবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাসানচর দেখতে যাওয়া আরেক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ‘চার ঘন্টা ভাসানচর ঘুরে দেখেছি আমরা। যা দেখেছি সবই ভাল লেগেছে। এখানে আমাদের খুব ভাল আপ্যায়ন করেছে। আগামীকালও ভাসানচর ঘুরে দেখানো হবে আমাদের।’

ভাসানচরে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদল

এ বিষয়ে হাতিয়ার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) গোলাম ফারুক বলেন, ‘রোববার দুপুরে ভাসানচর ঘুরে দেখেন কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি দল। এসময় তাদের আনন্দিত দেখা গেছে। এ ছাড়া ভাসানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তারা দেখা করেন। তবে তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে সেটি জানি না।’

শনিবার বিকেল ৫টার দিকে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি দল ভাসানচরে পৌঁছেছে জানিয়ে সেনাবাহিনীর রামু-১০ পদাতিক ডিভিশনের মুখপাত্র মেজর ওমর ফারুক বলেন, ‘চল্লিশ জনের রোহিঙ্গা নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল শনিবার ভোরে ভাসানচর দেখতে রওনা হয়েছিল। তারা দুপুরে চট্টগ্রামে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে জাহাজে করে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভাসানচরে পৌঁছায়।’

এর আগের দিন ভাসানচর দেখতে যাওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা মুঠোফোনে জানিয়েছিলেন, ‘বিকেল ৫টার দিকে আমরা ভাসানচরে পৌঁছেছি। এরপর একটি কক্ষে আমাদের সবাইকে ভাসানচরের আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি করা একটি ভিডিও চিত্র দেখান সেখানকার কর্মকর্তারা। রাত হয়ে যাওয়ায় রোববার সকাল থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু হবে। তবে ভাসানচরের যাতায়তে বিষয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে যে দূর অবস্থা কথা শুনছিলাম এখানে এসে সেটি মনে হয়নি। সরকারকে ধন্যবাদ জানায় আমাদের ভাল ব্যবস্থাপনায় ভাসানচরে নিয়ে আসার জন্য।’

এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভাসানচরে গেছেন। সরকারের আশা, রোহিঙ্গা নেতারা দেখে এসে অন্যদের বোঝালে ভাসানচর যেতে রাজি হবেন শরণার্থীরা। তবে এই দলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সহায়তাকারী জাতিসংঘের কোনো সংস্থার প্রতিনিধি বা গণমাধ্যমর্কীরা থাকছেন না। তবে আগে থেকে ভাসানচরে আরআরআরসি কার্যালয়ের তিন কর্মকর্তা সেখানে অবস্থান করছেন।

জাতিসংঘসহ শরণার্থীদের মানবিক সেবাদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতামত ছাড়া কমপক্ষে এক লাখ শরণার্থীকে ওই দ্বীপে স্থানান্তর করার লক্ষ্যে চলমান সরকারি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এদিকে শুক্রবার দুপুরে টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সাত রোহিঙ্গা নেতা তিন-চারদিনের প্রস্তুতি নিয়ে ক্যাম্প ইনচার্জের (সিআইসি) কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর সেনা প্রহরায় মাইক্রোবাসে করে উখিয়া পৌঁছায়। সেখানে বাকি রোহিঙ্গা নেতারাও জড়ো হয়। এরপর রাতেই তাদের সঙ্গে দেখা করে আরআরআরসি মাহবুব আলম তালুকদার ভাসানচরের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে গত মে মাসে ভাসানচরে নিয়ে যায় সরকার।

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা স্থানান্তরের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আশ্রয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ এবং এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের এক সভায় ভাসানচরের জন্য নেওয়া প্রকল্পের খরচ ৭৮৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা করা হয়। বাড়তি টাকা বাঁধের উচ্চতা ১০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ১৯ ফুট করা, আনুষঙ্গিক সুবিধা বৃদ্ধিসহ জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের জন্য ভবন ও জেটি নির্মাণে খরচ হবে।

বিডি/রো