হদিস নেই ৩ লাখ রোহিঙ্গার

রোহিঙ্গাদের সমাবেশ। ফাইল ছবি

মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী:

মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ছিলো-রোহিঙ্গা শরনার্থী আগমনের তিন বছর পূর্তি। ২০১৭ সালের এদিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা শরনার্থী আগমনের ঢল নেমেছিল। এদিন থেকে পরবর্তী প্রায় একমাস পর্যন্ত ১১ লক্ষ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন রোহিঙ্গা শরনার্থী বাংলাদেশে আগমন করেছিলো। এই সংখ্যা মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা শরনার্থী আসা শুরু হওয়ার পর পার্সপোট অধিদপ্তর ও সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে যে রেজিষ্ট্রেশন হয়েছিলো তার হিসাব। তাদেরকে রেজিষ্ট্রেশনের পর ডিআইপি (DIP) নামক পরিচয় পত্র দেওয়া হয়েছিলো। এরা বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি শরনার্থী ক্যম্পে আশ্রিত।

আবার, বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআর এর যৌথভাবে করা রেজিষ্ট্রেশন মতে, ৮ লক্ষ ১৯ হাজার ৭৮৭ জন রোহিঙ্গা রয়েছে ৩৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। যেখানে পরিবারের সংখ্যা এক লাখ ৭৯ হাজার ৫৯০টি। এখানে ২০১৭ সালের আগস্টের আগে আসা ৩৪ হাজার রোহিঙ্গাও রয়েছে। এই রেজিষ্ট্রেশন হয়েছে আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের কর্ণিয়ার ছবি যুক্ত ডাটাবেজ করে। যে রেজিষ্ট্রেশন বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সার্ভারে সংরক্ষিত আছে। আরআরআরসি অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, এই পরিসংখ্যান চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত আপডেট। কোভিড-১৯ জনিত পরিস্থিতির কারণে এর পর আর আপডেট করা যায়নি।

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাদের আগুনে পুড়ছে রোহিঙ্গাদের বাড়ী-ঘর। ফাইল ছবি

প্রথম পরিসংখ্যান থেকে দ্বিতীয় পরিসংখ্যানে রোহিঙ্গার সংখ্যা কমেছে ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৭৮৯ জন। এখন প্রশ্ন উঠেছে- কমে যাওয়া প্রায় ৩ লক্ষ রোহিঙ্গা কোথায় গেলো। সংশ্লিষ্ট সকলের ধারণা, তারা স্থানীয় জনসাধারণের সাথে লোকালয়ে মিশে গেছে। তাদের কিছু কিছু মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। তবে এই ৩ লাখ রোহিঙ্গা কোথায় গেছে, মূলত তা কারও জানা নেই। সরকারি-বেসরকারি সব মহলই মনে করছে, এসব রোহিঙ্গা লোকালয়ে মিশে যাচ্ছে। কক্সবাজার, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ৩ পার্বত্য জেলা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে তারা।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ।  ফাইল ছবি

গত ৩ বছরে একজন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করা না গেলেও ক্যাম্প থেকে উধাও হয়েছে এ ৩ লক্ষ রোহিঙ্গা। প্রতিদিনই বাড়ছে এই সংখ্যা। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি-ISCG)। হিসাবে না পাওয়া এই তিন লাখ রোহিঙ্গা কোথায় গেছে, তা ISCG এরও জানা নেই। ক্যাম্প ছেড়ে লোকালয়ে মিশে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দায়ভার আপনাআপনিই পড়ছে এই দেশের কাঁধে।

কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের দপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, ৩৪টি ক্যাম্পে প্রতিবছর গড়ে ৩০ হাজার ৪৩৮ শিশুর জন্ম হচ্ছে। এ হিসাব যোগ করলে গত তিন বছরে ক্যাম্পে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। আরআরআরসি অফিসের প্রদত্ত পরিসংখ্যান মতে, বছরে গড়ে গর্ভবতী হয় হয়-৩৫ হাজার ৪ জন রোহিঙ্গা মহিলা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও স্বীকার করছেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার ক্যাম্প থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার কথা। উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাপকভাবে। বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়ছে অথবা বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছে, তাদের আগে আসা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে থাকছে। তারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে ও স্থানীয়দের শ্রমক্ষেত্র কেড়ে নিচ্ছে। এভাবে রোহিঙ্গার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যাওয়া স্থানীয় জনসাধারণের জন্য বিরাট হুমকি বলে তিনি মনে করেন তিনি।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

আইএসসিজি’র সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, আট লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার জন্য এ বছর এক হাজার ৫৮ মিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সাহায্য চাওয়া হয়েছে। বছরের আট মাস পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত মিলেছে ৪০৯ মিলিয়ন ডলার, যা চাহিদার মাত্র ৩৯ শতাংশ। এর আগে ২০১৯ সালে প্রত্যাশিত ৯২১ মিলিয়ন ডলারের ক্ষেত্রে মিলেছিল চাহিদার মাত্র ৬৯ শতাংশ- ৬৩৫ মিলিয়ন ডলার। জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, ক্যাম্পে যে হারে রোহিঙ্গা কমছে, বিদেশি অর্থ সাহায্যও একই হারে কমছে।

কক্সবাজারে আইএসসিজি’র একজন প্রতিনিধি জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য প্রতিশ্রুত তহবিল না মেলায় পরিকল্পিত অনেক ব্যয় সংকোচন করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের জন্যও অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এতে দাতা সংস্থাগুলোও উদ্বিগ্ন। আইএসসিজি’র তথ্যমতে, দাতা দেশগুলোর মধ্যে এ বছর সবচেয়ে বেশি ১৭৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে আমেরিকা। এরপর অস্ট্রেলিয়া সরকার দিয়েছে ৩৮ মিলিয়ন ডলার। সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাজ্য।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি শরনার্থী ক্যম্পে আশ্রয়ে থাকা এসব শরনার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারের কাছে ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৯১৯ জন রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তর করেছিলো। যার মধ্যে রয়েছে, ২৭ হাজার ৯৯৯টি পরিবার। মিয়ানমার সরকার এদের মধ্য থেকে মাত্র ১০ হাজার ৩৩৬ জনকে ফেরত নেওয়ার জন্য ছাড়পত্র দিয়েছে। তারমধ্যে ৭৪ পরিবারের ২৩৪ জন হিন্দু ধর্মালম্বী রোহিঙ্গাও রয়েছে। কিন্তু এ ছাড়পত্র পাওয়ার দীর্ঘ দেড় বছর অতিবাহিত হলেও একজন রোহিঙ্গা শরনার্থীও মিয়ানমার সরকার ফেরত নেয়নি। পর পর ২ বার মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শরনার্থী প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য দিনক্ষণ ঠিক হলেও মিয়ানমার সরকারের অনীহায় ২টি প্রত্যাবাসন উদ্যোগ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। অথচ টেকনাফের কেরুনতলী একটি, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে আরো একটি সহ মোট ২টি প্রত্যাবাসন কেন্দ্র ২ বছর আগে থেকেই নির্মাণ করা আছে। আরআরআরসি অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, এই ২টি প্রত্যাবাসন কেন্দ্র ছাড়াও বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে আরো ২টি নতুন প্রত্যাবাসন কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

মিয়ানমার থেকে ২০১৭ সালের আগে যারা যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিলো, তাদের শরনার্থী মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট হতে আগত রোহিঙ্গাদের শরনার্থী মর্যাদা দেওয়া হয়নি।তাদেরকে বলা হয়, ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যূত মায়ানমারের নাগরিক’ অর্থাৎ Forcibly Displaced Myanmar Nationals (FDMN)। ৩৪ টি ক্যাম্পে অবস্থান করা এসব রোহিঙ্গারা তাদের আগমনের তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে আজ ২৫ আগস্ট কোন অনুষ্ঠান করেনি বলে জানা গেছে।

বিডি/রো